শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২৬

আগাম শীতকালীন সবজি চাষে ব্যস্ত কৃষকরা, পবা উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শে দেখছেন সফলতার মুখ

৮ অক্টোবর ২০২৫, ০৭:১০ অপরাহ্ণ
আগাম শীতকালীন সবজি চাষে ব্যস্ত কৃষকরা, পবা উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শে দেখছেন সফলতার মুখ
কৃষকের পাশে পবা উপজেলা কৃষি অফিসের কর্মকর্তাবৃন্দ

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহীর পবা উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মাঠে দেখা যাচ্ছে শীতকালীন আগাম সবজি চাষ। কৃষকেরা উন্নত জাতের ফুলকপি, বাঁধাকপি, শিম, টমেটো, মরিচ, বেগুন, লালশাক, পাটশাক, ধনেপাতা, পেঁয়াজ, কচু, পটল, পালংশাকসহ বিভিন্ন ধরনের আগাম শীতকালীন সবজি চাষ করেছেন। অসময়ে শীতকালীন সবজি চাষ করে উৎপাদন ভালো হওয়ায় বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং প্রচুর লাভের মুখ দেখছেন কৃষকরা। এর মধ্যে ফুলকপি, বাঁধাকপি, শিম শীতকালীন সবজি চাষের মৌসুম হিসেবে পরিচিত হলেও বছরে তিনবার সফলভাবে চাষ হচ্ছে। এছাড়াও করলা, বেগুন, গাজর, শসা, টমেটো, লাউ, কুমড়া, ঢেঁড়স, চিচিঙ্গা, পুইঁশাক, চালকুমড়া, মিষ্টি কুমড়া, ক্যাপসিকাম বিভিন্ন জাতের এই সবজিগুলো বছরজুড়ে বিভিন্ন ঋতুতে চাষ হয় এবং ফলন পাওয়া যায়। কৃষকদের আগাম এসব চাষের কারিগর উপজেলা কৃষি অফিসের কর্মকর্তাবৃন্দ।

 

কৃষকদের পাশে থেকে উন্নত প্রযুক্তি ও জ্ঞানভিত্তিক চাষাবাদে উদ্বুদ্ধকরণ এবং টেকসই পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতায় সফলতার মুখ দেখছেন তাঁরা। এর ফলে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের মধ্যে আগাম এসব সবজি চাষে দেখা যাচ্ছে এ পরিবর্তন। এতে যেমন কৃষকদের আয় বৃদ্ধি হচ্ছে তেমনি জীবনযাত্রার মানও উন্নত হচ্ছে। এছাড়াও বেসরকারি কৃষি বিষয়ক সংস্থাগুলোও এই পরিবর্তনের সাথেও অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। তাদের পরামর্শেও কৃষকরা আরো উৎসাহিত হচ্ছে যা টেকসই ও লাভজনক কৃষির দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য সহায়ক। তাদের সকলে কৃষি ও কৃষক তথা দেশের উন্নয়নে দক্ষতার সাথে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন অফিসের দাযিত্বরত কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণ। উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণে তাঁরা সবাই নিবিড়ভাবে জড়িত। কৃষির উন্নয়ন কর্মকান্ডে তাদের দক্ষ নেতৃত্বে, পরামর্শ ও সহযোগিতায় এগিয়ে যাবে দেশ, হবে উন্নত বাংলাদেশ। 

 

সরেজমিনে উপজেলার নওহাটা, হরিপুর, পারিলা, দামকুড়া, হড়গ্রাম. বড়গাছী, হরিয়ানসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায় শীতকালীন আগাম ও মৌসুমের বিভিন্ন জাতের ফুলকপি, বাঁধাকপি, শিম, মুলা, বেগুন, করলা, লাউ, লালশাক, পাটশাক, পটল, কচু, পুঁইশাক, টমেটো ও পালংশাকের চারা রোপণ ও পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন কৃষকেরা। তাঁরা ফসলের মাঠে নিজে অথবা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পুরুষদের পাশাপাশি নারী শ্রমিকরাও কাজ করছেন। নওহাটা ও খড়খড়ি কাঁচা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, আগাম জাতের লাউ, মুলা, লালশাক, ফুলকপি, শিম বাজারে উঠতে শুরু করেছে। এখনও সরবরাহ কম থাকায় দামও অনেক বেশি। 

 

নওহাটা পৌরসভার নামোপাড়া গ্রামের কৃষক কবির হোসেন বলেন, ‘সাড়ে তিন বিঘা জমিতে শীতকালীন সবজি ফুলকপি ও বাঁধাকপি চাষ করেছেন। শ্রমিকসহ নিজে নিয়মিত সবজির জমিতে পরিচর্যা করছেন। শীত শুরুর আগে বাজারে সবজি সরবরাহ করতে পারলে চাহিদাও থাকে এবং দামও ভালো পাওয়া যায়।’ একই এলাকার কৃষক হাবিবুর রহমান, রনি, আরিফ হোসেন ও মিঠু জানান, ‘তাঁরা সবাই দুই বিঘা জমিতে বাঁধাকপি চাষ করেছেন।’ 

 

দামকুড়া ইউনিয়নের আশগ্রামের কৃষক রুবেল আলী বলেন, ‘প্রতি মৌসুমেই শীতকালীন সবজির আবাদ করেন। এবার ১২ বিঘা জমিতে ফুলকপি, বাঁধাকপি ও শিম চাষ করেছেন।’

 

হরিপুর ইউনিয়নের সোনাইকান্দি গ্রামের কৃষক আনোয়ার হোসেন টমাস জানান, ‘সাড়ে চার বিঘা জমিতে আগাম জাতের ফুলকপি ও বাঁধাকপি চাষ করেছেন। জমিতে পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন।’ 

 

একই গ্রামের কৃষক শামসুল ইসলাম বলেন, ‘মৌসুমের আগে বাজারে সবজি তুলতে পারলে দাম ভালো পাওয়া যাবে সে আশায় এক বিঘা জমিতে আগাম জাতের লাউ চাষ করেছি। খরচ হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার টাকা। ফলন ভাল হয়েছে, বাজারে দামও ভাল পাচ্ছি, আশা করছি ভাল লাভ হবে।’ 

 

হরিপুর ইউনিয়নের বনপাড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল গফুর বলেন, ‘এক বিঘা জমিতে শিম চাষ করেছেন। ফুল ও ফল ফোটা শুরু হয়েছে। প্রাকৃতিক দূর্যোগ না থাকলে ফলন ভাল হবে আশা করছি।’

 

একই ইউনিয়নের নলপুকুর গ্রামের কৃষক আব্দুল হান্নান বলেন, ‘প্রতিটি ২০০/২৫০ গ্রাম ফুলকপি সরাসরি ক্ষেত থেকে ২৫-৩০ টাকায় বিক্রয় হচ্ছে, খুচরা বাজারে তার দাম ৪০-৪৫ টাকা। খুচরা বাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি ফুলকপি ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা বিক্রয় হচ্ছে।’

 

হুজুরীপাড়া ইউনিয়নের শরিষাকুড়ি গ্রামের কৃষক আমিনুল ইসলাম কৃষক হলেও পেশায় সবজি ব্যবসায়ী তিনি বলেন, ‘ধার-দেনা করে অনেক আশা নিয়ে আগাম লাউ এক বিঘা, কপি দুই বিঘা, পটল ১৫ কাঠা, লালশাক ১০ কাঠা. পালংশাক ১০ কাঠা, পাটশাক ১০ কাঠা চাষ করেছেন। তবে অতি বৃষ্টির কারণে জমি প্রস্তুত করতে দেরী হয়েছে তারপরও আবাদ ভাল হয়েছে। পটল বিক্রয় করে ভাল লাভ করেছি।’

 

একই ইউনিয়নের কবিরাজপাড়া গ্রামের কৃষক সানাউল্লাহ বলেন, ‘কপি দেড় বিঘা, শিম ১৫ কাঠা, পটল এক বিঘা, কচু দুই বিঘা চাষ করেছেন। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা কখন কি ফসল চাষ করতে হবে, কোন জাতের বীজ বপন করলে আবাদ ভাল হবে এ ধরনের পরামর্শ ও সহযোগিতা করে থাকেন। তাদের নির্দেশনা মেনে চাষাবাদ করি ফসলের উৎপাদন ভাল হয়।’

 

পারিলা ইউনিয়নের মতিয়াবিল গ্রামের কৃষক সজিব হোসেন বলেন, ‘মৌসুমের শুরুর দিকের উৎপাদনকৃত ফসল সবসময় বেশি লাভজনক হয়। আগাম সবজি বাজারে চাহিদাও প্রচুর হয় এবং দামও ভালো পাওয়া যায়। আড়াই বিঘা জমিতে মুলা চাষ করেছি। সার, বীজ কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরী সবমিলিয়ে উৎপাদনে খরচ প্রায় ৮০ হাজার টাকা। ফলন ভাল হয়েছে, এই সপ্তাহের মধ্যে তুলতে পারবো। এখন মুলা বাজারে ১৩’শ টাকা মন। উৎপাদন আড়াই’শ মন হবে আশা করছি।’

 

হরিপুর ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘সবজি চাষের প্রতি কৃষকের আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষকদের সর্বাধিক মুনাফা অর্জনে কৃষি সম্প্রসারণ অফিসের পক্ষ থেকে পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদানে কাজ করছি।’ 

 

নওহাটা পৗরসভা ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা জালাল উদ্দিন দেওয়ান বলেন, ‘আগাম সবজি চাষ এখন অত্যন্ত লাভজনক একটি পদ্ধতি। এতে একদিকে যেমন কৃষকের আর্থিক উন্নতি ঘটছে, অন্যদিকে স্থানীয় বাজারেও সবজির সরবরাহ বাড়ছে। তাই অনেক চাষি এখন আগাম জাতের চাষে ঝুঁকে নিজেদের জীবনে পরিবর্তন আনছেন। কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে কৃষকদের আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ, কীটনাশকমুক্ত উৎপাদন ও রোগবালাই দমনে নিয়মিত পরামর্শ অব্যাহত আছে।’

 

হুজুরীপাড়া ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম বলেন, ‘আগাম চাষে তুলনামূলক ঝুঁকি কম, কারণ এই সময় পোকামাকড়ের আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের প্রকোপ কম থাকে ফলে কীটনাশকমুক্ত ও গুণগত মানসম্পন্ন সবজি উৎপাদন সম্ভব হয়। কৃষক ফসলের বাজার মূল্য পায়, ফলে লাভবান হন।’

 

পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ এম. এ. মান্নান বলেন, ‘আগাম শীতকালীন সবজি চাষ এখন কৃষকদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। মৌসুমের শুরুতে বাজারে সবজি তুলতে পারলে কৃষকেরা ভালো দাম পান। আগাম সবজি চাষে জাত নির্বাচন, জমি প্রস্তুতি, সার প্রয়োগ ও সেচ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে মাঠপর্যায়ে উপজেলা কৃষি অফিসের কর্মকর্তাবৃন্দ নিয়মিত কৃষকদের পরামর্শ, সহযোগিতা ও প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। ফলে চাষাবাদে কৃষকদের আগ্রহ বৃদ্ধি হওয়ায় উন্নত, উচ্চ-ফলনশীল জাতের দিকে ঝুঁকছেন। আগাম ফুলকপি, বাঁধাকপি, লাউ, করলা, মুলা, শিম ও টমেটো চাষে ফলন ভালো হচ্ছে এবং দামও ভালো পাচ্ছেন। ভালো দাম পাওয়ার ফলে তাদের লাভ বেশি হচ্ছে। এতে প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষীদের মুখে হাসি ফুটছে।’

আরও পড়ুন.. কৃষি
← Home